
শরৎ মানেই যেন ঢাকার আকাশটা যেন একটু বেশিই নীল। কাশফুলের দোলা, ভোরের শিউলি ফুলের গন্ধ আর বাতাসে দুর্গা-পূজার আগমনী সুর—পুরোনো ঢাকার অলিগলিও তখন কেমন যেন নতুন হয়ে জেগে ওঠে।
তুমি আসবে বলে
সেদিন বিকেলেও আকাশটা ছিল মেঘমুক্ত। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের চারপাশে পূজার ব্যস্ততা। কোথাও ধূপের ধোঁয়া, কোথাও ফুলের মালা, কোথাও আবার ঢাকের তালে তালে মানুষের ভিড়।
ঈশান দাঁড়িয়ে ছিল মন্দিরের একপাশে। তার হাতে একটা ছোট্ট শিউলি ফুল। তিন বছর আগে এই মন্দিরেই মায়ার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল।
সেদিন দিনটা ছিল দুর্গাপূজা ১ম দিন। মায়া মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে দেবীর দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার হাতে থাকা শিউলি ফুলটা মাটিতে পড়ে যায়।
ঈশান ফুলটা তুলে দিয়েছিল। আর বলল-
—“আপনার ফুল।”
মায়া ফুলটা হাতে নিয়ে মুচকি হেসেছিল।
—“ফুলটা আমার, ধন্যবাদ আপনাকে ফুলটা তুলে দেয়ার জন্য।”
সেই ছোট্ট কথা থেকে তাদের দুুজুনের গল্পের শুরু। তারপর থেকে প্রতি শরতে তারা দেখা করত ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। কখনো পূজার ভিড়ের মধ্যে। কখনো মন্দিরের শান্ত কোনো কোণে কখনো শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঢাকের শব্দ শুনতো। তাদের প্রেমটা খুব জাঁকজমক পূর্ণ ছিল না। ছিল না বড় কোন প্রতিশ্রুতি। শুধু ছিল মায়ার লুকিয়ে থাকা মুচকি হাসি।
আর দুর্গাপূজার ভিড়ে একে অপরকে খুঁজে নেওয়ার অদ্ভুত অভ্যাস। কিন্তু এক শরতে সবকিছু যেন বদলে গেল। মায়াকে চলে যেতে হয়েছিল। শত চেষ্টা করেও সে থাকতে পারে নি তার প্রিয় মানুষটির কাছে। তাকে পরিবারের সঙ্গে চলে যেতে হয় বিদিশে।
যাওয়ার আগের দিন সে শুধু একটা কথাই বলেছিল,
—“আগামী শরতে যদি ফিরতে না পারি?”
ঈশান হেসে বলেছিল,
—“তাহলে আমি পরের শরৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করব।”
মায়া কিছুই বলেনি। শুধু ইশানের দিকে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সে চলে গিয়েছিল। শুধু একটা শিউলি ফুল ঈশানের হাতে দিয়ে চলে গিয়েছিল মায়া।
তারপর একে একে কেটে যায় তিনটি বছর। অনেক শরৎ আসলো গেল। দূর্গাপুজাও হলো। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রতি বছর নতুন করো আলো জ্বলল। শুধু মায়ার সেই মুচকি হাসি মুখ খানা আর দেখা গেল না। ইশার প্রতিবছরই এই দিনটায় ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করতো। পুজার একটা দিনও মিস করতো না। কিন্ত দিন শেষে তার মলিন হয়ে যাওয়া মুখ খানা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হতো।
হয়তো মানুষ কিছু জায়গায় যায় প্রার্থনা করতে নয়— পুরোনো কোন প্রিয় মানুষকে আপন করে পেতে। সেদিনও ঈশান মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। চারপাশে ঢাকের শব্দ। ধূপের গন্ধ। শরতের নরম বাতাস।
হঠাৎ পিছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ—
—“তুমি এখনও অপেক্ষা করছো?”
ঈশানের বুকের ভেতরটা হঠ্যৎই যেন কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল।
মায়া তুমি। আজ তিনটা বছর পর। এটা বলতেই ইশানের চোখে পানি চলে আসলো। সে খুশিতে কেদে দিলো। আর গিয়ে মায়াকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। চোখে সেই পুরোনো মায়া। তার হাতে এবারও একটি শিউলি ফুল।
ইশান মায়াকে ছেড়ে তার দিকে অনেক ক্ষন তাকিয়ে রইল। কিন্ত কিছুই বলতো পারলো না।
মায়া তখন মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি তো বলেছিলে, পরের শরৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।”
ঈশান নিচু স্বরে বলল,
—“আমি তো শুধু একটা শরতের কথা বলেছিলাম।”
মায়া চুপ করে তাকিয়ে রইল।
ঈশান হাসল।
—“কিন্তু তোমাকে ছাড়া শরৎগুলো তো শেষই হচ্ছিল না।”
মায়ার চোখও ভিজে উঠল।
দূরে তখন ঢাকের শব্দ আরও জোরে বাজতে শুরু করেছে। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। মানুষ দেবীর সামনে প্রার্থনায় দাঁড়াল। আর দুজন মানুষ—যারা তিন বছর ধরে নিজেদের ভাগ্যের কাছে হেরে ছিল—সেদিন আবার পাশাপাশি দাঁড়াল।
মায়া ধীরে করে ঈশানের হাতে শিউলি ফুলটা তুলে দিল।
—“এবার হারিয়ে ফেলো না।”
ঈশান ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“ফুলটা নয়।”
তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—“এবার তোমাকেই হারাতে দেব না।”
ঢাক বাজছিল। ধূপের ধোঁয়া উঠছিল। শরতের বাতাসে শিউলির ম-ম গন্ধ। আর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রাঙ্গণে সেদিন একটি পুরোনো ভালোবাসা আবার নতুন করে জন্ম নিল। কিছু মানুষ জীবনে আসে ক্ষণিকের অতিথি হয়ে।
আর কিছু মানুষ— তিন বছর দূরে থেকেও হৃদয়ের ভেতর ঠিক আগের জায়গাতেই থেকে যায়। হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক— দূরত্ব মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের অপেক্ষাকে নয়।