সবচেয়ে বেশি কষ্ট তো তখনই লাগে, যখন শত্রু নয়—নিজের সবচেয়ে বিশ্বাসী মানুষটাই তোমার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। আমি তখন ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ি। নতুন কলেজ নতুন বন্ধবান্ধব। এই কলেজে ভর্তি হওয়ার আরো একটা উদ্দেশ্য আছে আর তা হলো মেঘলা। আমি তাকে প্রথম দেখেছিলাম ক্লাস ৮ তে। প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিলাম জানি না কেন, তাকে প্রথম দেখাতেই আমার ভাল লেগে যায়। তাকে দেখলেই মনে ভিতরে অদ্ভত একটা অনুভুতি হতো। সে যখন আমার সামনে দিয়ে যেত আমার বুকের ভিতরটা ধরফর করতো। আমি প্রতি দিন স্কুলে যেতাম। শুধু তাকে দেখার জন্য। তাই বলে যে আমি পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম এমনটাও না। আমার রোল সব সময়ই ক্লাসে ১-৫ এর ভিতরেই থাকতো। ক্লাসে ঢুকলেই অজান্তেই মেঘলার দিকে চোখ চলে যেত। এমন না যে আমিই তাকে দেখতাম। সেও মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাতো। মুচকি হাসতো। আর তার এই ছোট ছোট মৃহুর্ত গুলোই আমার ভীষন ভাল লাগতো।
যে ভালোবাসা পাওয়া হলো না | বন্ধুই যখন শত্রু
ছোট বেলা থেকেই আমি খুবই লাজুক স্বভাবের। মনের কথা মনেই থেকে যেত। মুখে আনতে পারতাম না। আজ চার বছর ধরে একটা মেয়েকে পাগলের মত ভালবেসে চলছি কিন্ত আজও তাকে বলার সাহস টুকু হয় নি। শুধু দুর থেকে দেখেই তার হাসিতে নিজের সুখ খুজে নিয়েছি। আমি রাতুল আর আমার সব থেকে কাছের বন্ধু আবির। ছোট বেলা থেকেই আমরা এক সাথে বড় হয়েছি। তাই এমন কোন কথা ছিল না যা আবির কে শেয়ার করতাম না। হয়তো এটাই আমার জীবনের কাল হয়ে দারাল। আমি যে মনে মনে মেঘলাকে পছন্দ করি এটা আবির শুরু থেকেই জানতো। আবির শুধু বলতো আমারও মনে হয় মেঘলা তোকে পছন্দ করে। আর আবির যখন এই কথা বলতো আমারও শুনতে বেশ ভাল লাগতো।
আর সব সময় ভাবতাম এমন বন্ধু সবার ভাগ্যে জোটে না। আজ আমরা একই কলেজে। আবিরের অনেক সাহস মেয়েলি বিষয় নিয়ে। কারন ও ইতিমধ্যে ৪-৫টা মেয়ের সাথে রিলেশন করেছে। আর সব গুলোকেই ও কষ্ট দিয়েছে। তাদের শরীর নিয়ে খেলা করেছে। এভাবেই একই কলেজে দুই মাস কেটে গেল।
এর মাঝেই একদিন আমাদের কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলো। মেঘলা সেদিন অনেক সুন্দর করে সেজে এসেছে। আমি যেন মেঘলার থেকে চোখ ফিরাতেই পারছিলাম না। তাই আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই আজই মেঘলাকে প্রপোস করবো। আর আমার মনে একটাই কনফিডেন্স ছিল যে মেঘলা আমাকে রিজেক্ট করবে না। আমি সাহস করে মেঘলার সামনে গিলে দাড়ালাম। তখন মেঘলা একাই ছিল। আমার পুরো শরীর কাপছিল, গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। তবু আমি বললাম, আমি তোমোকে ভালবাসি মেঘলা। আজ চার বছর ধরে আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি।
- মামাতো বোনের সাথে বৃষ্টি ভেজা সেই রাত
- টাকার কাছে বিক্রি করা সম্মান Bangla Story Golpo
- যে ভালোবাসা পাওয়া হলো না | বন্ধুই যখন শত্রু
- রিকশা ওয়ালার বউ | রোমান্টিক গল্প
- লবণের পাত্র এবং একমুঠো ক্ষোভ
মেঘলা চুপ করে রইল,,, কিন্ত মেঘলা যা বলল আমি এটা কল্পনাও করিনাই। মেঘলা বলল আমি দুঃখিত রাতুল… আমি তোমাকে ভালবাসি না। আমি সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। এত্ত তাই কষ্ট পেলাম যে এক মূহর্ত আর সেখানে দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। সোজা বাড়ি চলে আসলাম। বাড়ি ফিরে রুমে দরজা দিয়ে সেদিন অনেক কেদেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার জীবনের এত্ত বছরের সপ্ন আশা সব এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। আমি পুরাই ভেঙে পরেছিলাম। আর আমার সেই কষ্টের সময়ও আমি আমার এত্ত কাছের বন্ধু আবিরকে পেলাম না।
কিন্ত কিছুদিনের ভিতরে যে সত্যটা জানতে পারলাম। তা মেঘলার রিজেক্ট করার থেকেও বেশি কষ্ট দিয়েছিল আমাকে। আমারই কলিজার বন্ধু আবির সে আজ দুই সপ্তাহ ধরে মেঘলার সাথে রিলেশনে আছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। যে মানুষটাকে আমি এতটা বিশ্বাস করতাম সেই গোপনে আমার মেঘলার সাথে রিলেশনে জরাল। যাকে আমি এত্ত বছর ধরে ভালবাসলাম। আমি পুরো একটা কোমার মধ্যে ছিলাম। আমার এই কোমা থেকে বের হতে কয়েক মাস সময় লাগলো। আমি এখন একা থাকি খুবই একা। আমি বড়লোক বাবার এক মাএ ছেলে। সব সময় আবিরকে নিজের ভাইয়ের মত দেখেছি। অনেকবার তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি। আবিরকে কখনো বুঝতে দেইনি যে আমি ওর থেকে আলাদা। কিন্ত আবির আমার বিশ্বাস, ভরসা, ভালবাসা সব ভেঙে দিয়েছে। সব সময় নরমাল ভাবে থেকেছি যাতে আবির কষ্ট না পায়। কিন্ত আর না।
আজ কলেজে ৭মাস চলে ৫মাস ধরে একদিনও কলেজে যাইনি। আবিরের সাথে কোন যোগাযোগও রাখিনি। খুবই একাকিত্ব বোধ করছিলাম। কিন্ত আমি কাটিয়ে উঠেছি। নিজের জীবনকে আরো সুন্দর করে সাজাতে হবে। তাই ৭মাসের মাথায় আমি সিদ্ধান্ত নেই। এখন থেকে আমার নতুন জীবন শুরু করবো। সেদিন আমি আমার সব থেকে দামি গাড়িটি নিয়ে কলেজে যাই। আমার পোশাক ছিল অনেক দামি। পায়ের জুতা থেকে হাতের ঘরি সবই ছিল দেখার মত। আমি গাড়ি থেকে নামতেই পুরো কলেজ যেন আমাকেই দেখছিল। সেদিন মেঘলাও আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কিন্ত আমি তাকে খেয়াল করি নাই এমন ভাব করে চলে গেলাম। ক্লাসে যেতেই সব ছেলে মেয়েরা আমাকেই দেখছিল। আমার পুরনো কিছু বন্ধু তারা তো আমাকে দেখে খুবই খুশি হলো।
কিন্ত আবির সে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও আমি তাকে পাত্তাই দিলাম না। সেদিন থেকে শুরু করলাম পড়াশোনা। আর মেঘলা আর আবিরযে ক্লাসে আসে এটা আমি কখনো খেয়ালই করতাম না। তাদের ভালবাসা চলতে লাগলো। তারা আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে রোমান্টিক কথা বার্তা বলতো কিন্ত আমি সব সময়ই এটা ইগনোর করে চলতাম।
কিন্ত এর মাঝেই একদিন আবির আমার কাছে এসে মেঘলার ব্যাপারটা নিয়ে ক্ষমা চাইলো। তখন আমি আবিরকে বলি তুই তো জানতি আমি মেঘলাকে কতটা ভালবাসতাম। কিন্ত তুই কিভাবে এটা করতে পারলি? আবির মাথা নিচু করে রইল। সে বলল কিভাবে কি হয়ে গেল। আমি তখন বললাম কিভাবে কিছুই হয়নি। আমি সবই জানতে পারছি। তুই মেঘলার কাছে আমার সম্পর্কে বাজে বাঝে কথা বলতি। যে আমি বোকা, সাহস নাই, কথা বলতে পারি না আরো কত কি। আর এসব বলেই তুই মেঘলাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিস। ঠিক আছে মেঘলাকে নিয়ে ভাল থাকিস। আর কোনদিন এই মুখ নিয়ে আর আমার সামনে আসবি না। জানিস তো কিছু বিশ্বাস ভেঙে গেল আর কোন দিন জোড়া লাগে না।
সেদিন আবিরকে কথা গুলো বলে নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছিল। এভাবেই দেখতে দেখতে ইন্টার ১ম বর্ষ পরিক্ষা শেষ হলো। তারপর একটা লম্বা টুর দিলাম। আর আমার টুরের প্রতিটা ছবি ফেসবুকে আপলোড দিলাম। কারন এখন সময় শো আফ করার। এর আগে আমি যতবারই টুর দিয়েছি আবিরকে সাথে করে নিয়েছি। কিন্ত এবারই প্রথম আবিরকে ছাড়া। কিন্ত তাতে আমার মোটেও খারাপ লাগছিল না। আর আমার প্রতিটা পিক দেখে আবির আর মেঘলা লাভ ইমুজি দিল। আর অনেক মেয়ে আমার ছবির কমেন্টে বক্সে অনেক রকম কমেন্ট করতে লাগলো।
পরিক্ষার রেজাল্ট বেরাতেই পুরো কলেজে আমার নাম ছড়িয়ে পরলো। কারন আমিই কালেজে টপার হয়েছি। এর মাঝেই নতুন নতুন ছেলে-মেয়েরা কলেজে ভর্তি হতে শুরু করলো। তার মাঝে একটা মেয়ে ছিল পুজা। যে ছিল পুরো কলেজের ভিতরে সব থেকে সুন্দরী। মেঘলার থেকেও কয়েক গুন বেশি। প্রথম দেখাতেই আমার পুজাকে ভাল লেগে যায়। আর আমিও এক মুহূর্ত দেরি না করেই পুজাকে প্রপোস করে ফেলি। যদিও পুজা প্রথম প্রথম রাজি ছিল না। কিন্ত কলেজে কয়েকদিন যেতেই সে যখন জানতে পারে আমিই কলেজের টপার তাছাড়া বড়লোক্স সে একটু ভাবসাব নিলেও রাজি হয়ে যায়। এখন প্রতিদিনই আমি আর পুজা একসাথেই কলেজে আসি। পুজার সাথে আমাদের রিলেশন অনেক ভাল চলছে।
তবে এর ভিতরেই উরা উরা শুনতে পাই আবির আর মেঘলার সম্পর্কে ভাঙন ধরেছে। পরে জানতে পারলাম আবির আগের মতই অন্যে আর একটা সম্পর্কে জরিয়েছে। তবুও মেঘলার জন্য খারাপ লাগছিল। কারন কষ্ট কাকে বলে সেটা আমি জানি। এর মাঝেই হঠ্যৎ একদিন মেঘলার সাথে দেখা। যদিও আমার কথা বলার তেমন ইচ্ছা ছিল না। কিন্ত মেঘলাই এগিয়ে এসে কথা বলল। রাতুল তুমি অনেক বদলে গেছ। আমি তখন হেসে বললাম ”সময় মানুষকে বদলে দেয়।”
তারপর সে বলল, তোমার কথা খুব মনে পরে। তখন হয়তো আবিরের মিথ্য কথায় আমি তোমাকে ভুল বুঝে ছিলাম।
তখন আমি বলি কারো মিষ্টি কথায় তার চরিত্র প্রকাশ পায় না। চরিত্র প্রকাশ পায় ব্যাবহারে। আমরা সবাই জীবনে কোনো না কোন সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেই। হয়তো এটাই তোমার ভুল ছিল। জানো মেঘলা সেদিন আমি খুব কেদেছিলাম। পুরো ৫টা মাস আমি ঘর থেকে বের হইনি। কারন আমি তোমাকে ভালভাসতাম। অনেক ভালবাসতাম। কিন্ত সব শেষ। তুমি এক মৃহূর্তেই আমার আশা ভরসা সব শেষ করে দিছো।
হয়তো ওটাই আমার জীবনের টারিং পয়েন্ট ছিল। নয়তো আজ আমি কখনো এরকম একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পারতাম না। আর কে বিশ্বাস ঘাটক এটাও বুঝার ক্ষমতা কোন দিন হতো না। যাই হোক ভাল থেক। আমার গার্লফ্রেন্ড আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
হয়তো আমি মেঘলাকে পাইনি। কিন্ত আমি আমাকে পেয়েছি। নিজেকে ফিরে পেয়েছি। কিন্ত আমি কাউকে ঠকাইনি।
আজ ৫বছর পর। আমি এখন আমার বাবার বিজনেস অনেক বড় করেছি। আর পুজা আমার এসিসটেন্ট এবং আমার ভালবাসা। আমার বউ। আমি মেঘলাকে হারিয়েছি। কিন্ত আমি মানুষের মত মানুষ হতে শিখেছি। আজ নিজেকে নিয়েই নিজে গর্ব ফিল করি। আর আমার সেই বন্ধু এখন বেকার। সে এখনো বিয়ে করতে পারেনি।
কিছু ভালোবাসা আমাদের কাছে আসে থাকার জন্য নয়; আসে আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য।