আমি রিক্সা চালাই। অভাবের সংসার। বিয়ে করেছিলাম আজ থেকে ২বছর আগে। রিকশা ওয়ালার বউ | রোমান্টিক গল্প! ঠিক আমার মতই গরীব ঘরের এক মেয়েকে। সংসারটা অভাবের হলেও খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ছিলাম আমরা। আমার বউ আমাকে অনেক ভালবাসে। আমি যখন রিক্সা চালিয়ে বাড়ি ফিরতাম একদম রাস্তার সব ধুলো ময়লা মেখে তখনই বউ ই প্রতিদিন আমাকে গোছলের জন্য জল এগিয়ে দিতো।
রিকশা ওয়ালার বউ | রোমান্টিক গল্প
বাড়িতে কারেন্ট ছিল না, আমি খেতে বসলে ও আমাকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করে। গরমের রাতে আমরা আদল বদল করে পাখা দিয়ে একে আপরকে বাতাস করে দিতাম। ভবিষ্যৎ টাকে কিভাবে আরো সুন্দর ভাবে সাজানো যায় এর জন্য আমরা প্রতিদিনই গল্প আর পরিকল্পনা করতাম। এভাবেই গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে যেতাম তেরই পেতাম না।
আমি যখন ঢাকার রাস্তায় রিক্সা চালাই তখন বড় বড় সাহেবরা তাদের বউকে নিয়ে উঠে। দুজনে মিলে কত গল্প করে। কখনো কখনো অনেক সাহেবদের কথা থেকে শুনতাম তারা যেদিন বিয়ে করেছে সেদিন নাকি তারা অনুষ্ঠান, পার্টি করে। আমার অবশ্য এসব সম্পর্কে তেমন জানা শোনা নাই। কিন্ত যখন শুনতাম তখন আমারো বউকে একটা শাড়ী কিনে দিতে বা কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে খুব ইচ্ছা করতো। কারন আমি আমার বউকে বড্ড বেশি ভালবাসী।
কিন্ত অভাবের সংসার, দিন আনি দিন খাই। চাইলেই কি আর সব ইচ্ছে পূরন হয়? অনেক বছর হলো একটা মাটির ব্যংক কিনেছিলাম। ওটায় বিয়ের আগে থেকেই রোজ যা পারতাম তাই ফেলতাম। আজ বিয়ের দুই বছর পর মাটির ব্যংকটা পূর্ন হলো। আমি মনে মনে অনেক খুশি। কারন আজ আমার মনের ছোট সপ্ন পূর্ন হতে চলছে। আজ সকালে বউকে না জানিয়েই মাটির ব্যাংকটা ভাংলাম। হিসেব করে দেখলাম দুই হাজারের মত টাকা হইছে। মন আমার বেশ খুশি। আর বাড়ি থেকে বের হবার আগে বউকে বললাম আজ বাড়িতে ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। বউও মাথা নেড়ে বলল সাবধানে গাড়ি চালাবেন।
সকাল থেকে শুরু করলাম রিক্সা চালানো পুরো সন্ধা প্রর্যন্ত কাজ করে আরো বেশ কিছু টাকা হলো। চলে গেলাম শহরের বড় একটা মার্কেটে। আজ রাতে বউকে একটা শাড়ী আর কিছু কাচের চুরি গিফট করবো। ঘুরে ঘুরে অনেক শাড়ীই দেখলাম, পছন্দ তো হয় কিন্ত দাম অনেক বেশি। আবশেষে দোকানিকে বলে দুহাজার টাকার ভিতর ভাল একটা শাড়ী কিনলাম। নীল কালারের শাড়ী। আর আমার বউয়ের নীল কালার অনেক পছন্দ। আবশেষে তার জন্য আরো কিছু কাচের চুড়িও কিনলাম।
আজকে ফুরফুরে মেজাজেই বাসায় ঢুকলাম। বউ আজ আমার দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সে বুঝে গেছে যে আজকের দিনটা অন্য দিনের থেকে একটু আলাদা। আমারও অনেক দিন পর মনটা একটু খুশি খুশি লাগছিল। কারন অনেক দিন হলো বউকে ভাল কিছু দিতে পারি নাই। শাড়িটা প্রথমেই দিলাম না। রাতে খাবার খেয়ে ফ্রেশ হয়ে বউ যখন ঘুমাতে আসলো। এটাই মনে হয় আমার জন্য উপযুক্ত সময়। রাত বাজে তখন ১০.৩০ আর আমি মনে মনে ভাবছি বউকে এটা পেয়ে খুশি হবে। নাকি তাকে এর থেকেও ভাল কোন উপহার দিতে হবে। ভাবলাম একদিন তাকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যাবো অন্য একজনের রিকশায় সারাদিন ঘুরবো আমরা একসাথে হাতে হাত রেখে।
ভাবতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। বউ এসে বসতেই তাকে ডেকে হাতে শাড়ীটা হাতে তুলে দিলাম। তারপর বললাম শুভ বিবাহ বার্ষিকী। আজকের তারিখে তুমি আমার এই কুড়ে ঘরে এসেছিলে প্রিয়। তাই আমার পক্ষ থেকে আমাদের বিবাহ বার্ষকীতে এই ছোট্ট উপহার তোমার জন্য। বউ আমার হাত থেকে শাড়ীটা নিলো। শাড়ীটা বুকে জরিয়ে ধরে চোখ দিয়ে অঝড়ে পানি ঝড়তে লাগলো। আমি তখন তাকে জরিয়ে ধরলাম। আর বউয়ের চোখের জল মুছে দিলাম। এবার বউ উঠে গেল তারপর সে আলমারী থেকে একটা পাকেট বের করে আনলো। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। পাকেট টা আমার হাতে দিল আর বলল এটা আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য। আমি দেখলাম ভিতরে একটা নতুন দামী লুঙ্গি। আমি পুরো আবাক হয়ে গেলাম।
তারপর জিগ্গেস করলাম তুমি টাকা পেলে কোথায়?
সে বলল আমি বাড়িতে যে হাস মুরগি পালি। সেখান থেকেই মাঝে মাঝে দুই একটা ডিম বিক্রি করি। আর ওই টাকা থেকেই তোমার জন্য লুঙ্গিটা কিনেছিলাম। ভেবে ছিলাম আজকে রাতে দিবো কিন্ত তার আগেই তো আপনি সারপ্রাইজ দিয়ে দিলেন। আমি এবার বললাম আমি যখন রিক্সা চালাই তখন শুনছি বড় সাহেব রা কেক কেটে তাদের বিবাহবার্ষকী পালন করে।
তারপর বউ বলল দাড়াও। এটা বলেই সে বাড়িতে থাকা ডিম তৈরী করা একটা কেক আমার সামনে এনে দিল। আমি তো বউয়ের এসব কান্ড দেখে পুরো আবাক হয়ে গেলাম। বললাম তুমি এত্ত কিছু জানলে কিভাবে। তখন বউ বলল আমি পাশের বাড়ির কাকির কাছে সব কিছু শুনছি। এরপর আমরা দুজনে একসাথে কেক কেটে একে আপরকে খাইয়ে দিলাম।
আমাদের ২য় বিবাহ বার্ষিকী এভাবেই পালন করেছি। এই ছোট্ট ছোট্ট গিফট আর অফুরান্ত ভালবাসায় বেচে থাকুক আমাদের মত রিকশা ওয়ালাদের সুখের সংসার। ❤️
সমাপ্ত