আপন মানুষটাই যখন অপরাধী | একটি সচেতনতামূলক বাংলা গল্প

আজ আমি আমার খুবই কাছের একজন মানুষের কাছ থেকে যৌন হারাসমেন্ট এর শিকার হলাম। এটাকে ধর্ষণ বললেও ভুল হবে না। আমি কখনো কল্পনাও করি নাই এই মানুষটা এট লিস্ট এই মানুষটা এমন একটা কাজ করতে পারলো। হা বলছিলাম আমার আপন চাচার কথা। যে মানুষটার ওপর আমি ছোট সময় থেকে এত্তটা বিশ্বাস করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই আমাকে। ছি বলতেও ঘৃনা করছে।

আপন মানুষটাই যখন অপরাধী | একটি সচেতনতামূলক বাংলা গল্প

এই মূহুর্তে আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। মাথার উপর ভন ভন একটা বিরক্তি শব্দ করে ফ্যান ঘুরলেও আমার সেই দিকে কোন অভিযোগ নাই। আমার সমস্ত অভিযোগ এখন পুরুষ জাতির ওপরে। আমার মা হাসপাতালে আমার রুমের সামনে বসে কান্না করছেন। আর আমি ভাবছি পুরুষ জাতি কতটা খারাপ হলে নিজের আপন ভাইয়ের মেয়ের সাথে এসব করতে পারে।

ঘটনা টা পহেলা বৈশাখের দিন। সবাই যখন ঘোরাঘুরি তে বাস্ত আমিও শান্ত থাকতে পারলাম না। আমার ছোট চাচা আমার থেকে ৪-৫ বছরের বড়। আমার বাপ কাকারা মোট ৭ ভাই।  তাই ছোট কাকার সাথে বয়সে ম্যাচ করাটাও স্বাভাবিক।

আর প্রায় সমবয়সী হওয়াতে আমি ছোট থেকেই চাচাকে নিজের বন্ধুর মতোই ভাবতাম। যখন যেখানে যেতাম বা ছোট খাত দরকারে চাচার কাছ থেকেই সাহায্য নিতাম। তেমনি ভাবে চাচাকেও অনেক কিছু তে সাহায্য করতাম। কোন মেয়েকে ভাল লাগলে প্রপোজ করে দেয়া, বাসায় চাচার পক্ষে কথী বলা এটাই বা কম কিছে।

তো সেই দিন আমি চাচাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই চাতা রাজি হয়ে গেল। সেদিন যদি আমি তার সাথে না যেতাম তাহলে হয়তো আমি বেচে যেতাম।

কিন্ত ভুল তো ভুলই। …

আমি শারমিন । বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার বাপ চাচারা মোট ৭ ভাই। আমি এখন ইন্টারে পরি। আর চাচা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তবে এটা শুধু একটা গল্প না। এটা সবার জন্য একচা শিক্ক্ষা। একটী মেয়ে মানুষ কোন ছেলের কাছেই সেইফ না।

সেদিন পরিবারের কাউকে কিছু বলেই আমি চাচার সাথে বেরিয়ে পরলাম ঘুরতে। সারাদিন চাচার সাথে অনেক জায়গায় ঘুরলাম। বিভিন্ন পার্ক, রেস্টুরেন্টে।

সব কিছু চাচা-ভাতিজা ইনজয় করতে লাগলাম। সেই সাথে অনেক অনেক ছবি তুললাম।

সন্ধা হতেই চাচা বললো চলো সামনে একটা সুন্দর লেকভিই আছে অনেক সুন্দর আর খুবই শান্ত পরিবেশ। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। সেখানে একদমই মানুষ ছিল না। পুরাই নিরিবিলি একটা জায়গা।

হটাৎ ই দেথলাম দুজন ছেলে এসে হাজির। এসে চাচার সাথে কথা বলতে লাগলো। আমি বললাম চাচা কারা এইযে।–

চাচা বলল আমরা ভাই ব্রদার। এক সাথেই থাকি। কিন্ত সেকেন্ড এর ভিতরে পরিবেশ সম্পূর্ণ বদল্লে গেল। চাচা তার বন্ধুর মাধ্যমে আমার কাছে ক প্রস্তাব পাঠালো। আমি সাথে সাথেই সেই ছেলেকে একটা চর মারলাম। আর চলে আসতে গেলাম।

কিন্ত তারা তিনজন আমাকে ছাড়লো না। তাদের শক্তির কাছে আমি পেরে উঠলাম না। তারা পুরো তিন ঘন্টা বসে আমার সাথে খারাপ কাজ করে গেল। আমাকে যৌন হারাসমেন্ট করলো। যা বিস্তারিত ভাষায় প্রাকাশ করা সম্ভব না।

সেদিন একপলকে সমস্ত পুরুষ মানুষের উপর থেকে আমার বিশ্বাস উঠে গেল। যেন আমার পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছিল।

আমি কোন মতে চাচার সাথে হা তে হা মিলিয়ে বাড়ি ফিরলাম। কারন চাচা পথে আমাকে নানান ভয় দেখাতে লাগলো। আর আমি তার প্রতিটা কথায় হা তে হা বলতে লাগলাম।নয়তো নরপশু টা হয়তো আমাকে রাস্তায় মেরে লাশ করে রেখে যাবে। 

বাড়ি ফিরতেই আমি আর এক মূহুর্ত দেরি করলাম না। সোজা মা বাবাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। এবং তারা ঘটনা শুনতেই তাদের মাথায় রক্ত উঠে গেল। এই দিকে আমি এখনো ঠিক মত হাটতে পারছি না। তাই বাবাকে বললাম আমি এত্ত কিছু জানিনা আমি এখনই থানায় যাব পুলিশের কাছে। সাথে তোমাদেরও যেতে হবে। কিন্ত বাবা তো এখনই চাচাকে মারতে যাব কিন্ত আমার নিষেধ করাতে সে আগে থানায় যেতে রাজি হয়।

তখনই আমি আর মা বাবা কাউকে কিছু না বলেই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। চাচা যেন আমাদের বাড়ি থেকে তাড়া হুরো করে বের হয়ে যাওয়া দেখে ভয়ে আকাশ থেকে পড়লো। যদিও মা বিষয়টা নিয়ে আর না বাড়ানোর কথাই বার বার বলছিল। বার বার বলছিল যা হয়েছে এখানেই চেপে যাওয়া ভাল। কারন এতে আমাদেরই মান সম্মান যাবে। কিন্ত আমি মায়ের কথায় কোন কানই দিলাম না। কারন আমি আমার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যয় এর বিচার চাই। আর এটাই আমার সব থেকে বড় শক্তি।

আমরা থানায় পৌছাতেই একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা বলল মা তুমি সাহস করে এসেছে এটাই তোমার সব থেকে বড় শক্তি। সেই সাথে তারা একটা জিডি নিয়ে আমাকে চেকআপের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করলো। পুলিশ তার নিজের মত করে তদন্ত শুরু করলো। তারা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল লোকেশন এক এক করে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করল। চাচা হয়তো ভেবেছিল সে আমাকে ভয় দেখিয়েই পার পেয়ে যাবে। কিন্ত শেষ রক্ষা হলো না। পরদিনই তারা তিনজনই গেপ্তার হলো। সেই সাথে আমাকে চেকআপ করে ধর্ষন প্রমানিত হলো।

আমি ভেবেছিলাম এখানেই সব শেষ। কিন্ত আসল যুদ্ধ শুরু হলো সামাজিক ম্যাধ্যম আর নিউজ ম্যাধ্যমে। একের পর এক সংবাদিক আমার ইন্টার ভিউ নেয়ার জন্য আসতে লাগলো। যাদের বেশির ভাগই ছিল ভিউ ব্যাবসায়ী চটি সংবাদিক। আমি প্রথমে ভেবে ছিলাম তারা হয়তো সত্যটা জানতে চায়। কিন্ত তাদের প্রশ্ন গুলো ছিল খুবই বাজে ধরনের। তাদের অগ্রহ ছিল ঠিক আমার চাচার মতই। আমি নিরমে তাদের প্রশ্ন গুলো এড়িয়ে যেতে লাগলাম।

আমি তাদের প্রশ্ন গুলো শুনে পুরাই আবাক হয়ে গেলাম। কারন তাদের প্রশ্ন গুলো অপরাধীকে নিয়ে ছিল না। ছিল আমার শরীর নিয়ে। কিন্ত আমি তাদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াতে উল্টো কিছু সংবাদিক আমাকেই দোষ দিতে লাগলো। সেই সাথে আমার কিছু কথা কেটে কুটে উল্টা পাল্টা করে আমাকেই দোষী বানানের চেষ্টা করা হলো। যখন হাজার হাজার মানুষ আমার ভিডিও টা সমাজিক মাধ্যম এবং কিছু নিউজ পেপারে দেখতে পেল। তখন আমি কেন চাচার সাথে গিয়ে ছিলাম, কেন সন্ধা বেলায় তার সাথে ছিলাম। কিন্ত একবার প্রশ্ন করলো না চাচা কি দুরের কেউ। চাচা তো বাবার মতই। চাচা হয়ে সে কিভাবে এটা করতে পারলো?

সেদিন আমি বুঝলাম মানুষ কখনো সত্য জানার চেষ্টা করে না। তারা সামাজিক মাধ্যমের অন্যর ধারন করা কথার উপর নিজের বিচার করতে বেশি পছন্দ করে। তাতে আমি পুরাই ভেঙে পড়েছিলাম। আমার মা আরো বেশি টেনশন করতে লাগলো আমাকে নিয়ে।

কিন্ত আবশেষে আমার মনে যেন একটু শান্তি প্রতিষ্ঠা পেল। কারন এদালতে যখন মাসের পর মাস মামলা চলল তখন আমাদের পুরো পরিবার খুবই টেনশনে ছিল। আমার চাচারা ভাগ হয়ে গেছিল কেউ আমাদের পক্ষে আবার কেউ ছোট চাচার পক্ষে। তবে যখন আদালতে প্রামান উপস্থাপিত হলো। আবশেষে আদালত রায় দিল। রায়টা সত্যের পক্ষে হওয়াতে আমরা সবাই খুশি ছিলাম।

ওই তিনজনই দুষী সাব্যস্ত হলো। তাদের যাবৎজীবন কারাদন্ডের রায় দেয়া হলো। আবশেষে নরপশু গুলো তাদের উপযুক্ত শাস্তী পেল।

আজ এই ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এখন আমি আর কাউকে বিশ্বাস করি না। আমি আবার নতুন করে আমার জীবন শুরু করেছি। আমার পড়াশোনা শুরু করেছি। আমি আবার বাচতে শিখেছি। কিন্ত আমি আমার পর্বের ইতিহাস ভুল ভুলে যাই নি। তাই এখন সব সময় সাবধানে চলফেরা করি।

আজও মাঝে মাঝে সেই দিন গুলো কথা মনে পরে। সেদিন যদি চাচার সাথে না যেতাম বা চাচা আমার সাথে এসব না করতো তাহলো হয়তো আমাদের সম্পর্ক গুলো অন্য রকম হতে পারতো।

কিন্ত সবার কাছে একটাই প্রশ্ন কাউকে বিশ্বাস করা কি পাপ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top