রাত তখন প্রায় ২টা বাজে। আমাদের নতুন বাড়িটা পুরনো শহরের সরু রাস্তার ধারে তিনতলা বাড়িটা, গতমাসেই এই নতুন বাড়িটা আমরা ক্রয় করেছি। বাবার অনেক দিনের একটা সপ্ন ছিল যে নিজেদের বড় একটা বাড়ি হবে আর গতকালই টা পূর্ন হয়েছে। কারন গতকালই আমরা এই নতুন বাড়িতে এসে উঠেছি।
বন্ধ জানালা | বাংলা ভুতের গল্প
কিন্ত নতুন বাড়ি। আর অচেনা জায়গা। বিছানায় বসে মোবাইল টিপছি। আমি রায়হান বর্তমানে অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ি। বাসাটা বাবা একটু কম টাকাতেই পেয়েছে তাই আমাদের পুরো পরিবারই মোটামুটি খুশি। সেইদিন ওভাবেই আমি যে কখন ঘুমিয়ে পরি তেরই পাইনি। পরদিন সকাল বেল আমাদের নতুন বাড়িতে উঠা তাই পাশের বাসার অনেকেই এসেছে পরিচিত হতে।
তখনই দেখা হয় এক চাচার সাথে। তিনি আমাকে বলে বাবা শুন তুমি নাকি ওই দুতালার রুম টায় থাকো। তুই তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। এই বলে তিনি আমাকে একটু পাশে নিয়ে গেলেন। তারপর বললে”
– বাবা তুমি তো ওই রুমে থাকবে। তোমাকে একটা কথা বলি তুমি রাতে ওই উত্তর পাশের জানালা টা খুলবে না। কখনো না।” .
চাচার মুখ থেকে এই কথাটা শুনতেই যেন আমার শরীরটা ভারী হয়ে গেল। আর কথাটাও আমার মাথায় গেথে গেল।
কিন্ত তারপরও আমি চাচার কথা হেসে উড়িয়ে দিলাম। “কি বলেন চাচা আজকাল ভুত পেত বলতে কিছু হয় নাকি? এই গুলো সবই আজগুবি কথা।”
চাচা আমার কথা মুনে আর কিছুই বলল না। শুধু বলল বাবা জানলাটা খুলো না। তাহলে তোমার খুব বিপদ হতে পারে। কিন্ত আমি চাচার কথায় তেমন পাত্তা দিলাম না। যদিও আমার শরীর টা একটু ভারী লাগছিল। চাচার মুখ থেকে এই কথা শুনেই আমি সোজা উপরে চলে গেলাম। গিয়েই আমার জ্বানালা টা খূলে দিলাম কই কিছুই তো নাই। শুধু দূরে একটা তাল গাছ দেখতে পেলাম। কিন্ত সময়টা দিনের বেলা ছিল।
তবে একটা জিনিস আমার চোখ এড়ালো না। আর তা হলো জ্বানালা টা কেমন জানি অন্য জ্বানালার থেকে একটা বড় বড় লাগে। তাই আমি আমার ব্যাগ থেকে একটা মাপের ফিতা বের করে জ্বানালাটা মাপতে শুরু করলাম। কিন্ত না সব জ্বানালার সাইজ তো একই কিন্ত এটা বড় লাগে কেন? আমার মনের খটকা টা বাড়তে লাগলো। তাহলে কি চাচার কথায় আসলেই কোন রহস্যা আছে যা আমি জানি না।
- রোবটের ভালোবাসা | সাই-ফাই বাংলা গল্প
- সৎ ভাইয়ের প্রেমে! অবৈধ ভালবাসার গল্প
- বন্ধ জানালা | বাংলা ভুতের গল্প
কিন্ত এর মধ্যে মায়ের ডাকে জ্বানালার কথা আমি ভুলেই গেলাম বাস্ত হয়ে পরলাম পরিক্ষার টেনশনে। কারন কিছু দিন পরে আনার্স ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরিক্ষা। তাই রাত জেগে পড়াশোনা করতে লাগলাম। জ্বানালার কথা একদম ভুলেই গেছি। এর মাঝেই একদিন রাতে পড়াশোনা করতেছি তখনই চোখ গেল জ্বানালার দিকে। আর চাচার কথা টা মনে পরে গেল। আমি চুপি চুপি গেলাম জ্বানালার কাছে। কারন আমার মনে একটা আজানাকে জানার যে প্রবল ইচ্ছে ছিল সেটাই কাজ করছিল। জ্বানালার কাছে যেতেই আমি একটা টুপ টুপ টুপ কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। কেউ যেন বড় বড় নখ দিয়ে জ্বানালাকে আঘাত করছে আর বাচাও বাচাও বলে কান্না করছে।
শব্দটা থেমে থেকে কিছুক্ষন পর পরই হচ্ছিল। কখনো একটু জোরে আবার কখনো একটা আস্তে। আমি একটু সাহস নিয়ে জ্বানালার কাছে কান পাতলাম। আর কান দিতেই আমার কলিজা থেকে যেন পানি শুকিয়ে গেল। কারন শব্দটা একদম জ্বানালার আপর পাস থেকে আসছিল।
আমি সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। আর ভয়ে জ্বানালাও খুললাম না। এরপর থেকে প্রতি রাতেই সেই শব্দ টা শুনতে পেতাম। কখনো জোরে আবার কখনো আস্তে। এর মাঝেই কয়েকদিন পর আমি জ্বানালায় কান পাতলাম। তখনই একটা মেয়েলি কন্ঠে আমাকে বলল,
-জানালাটা খোলো…
কিন্ত আমি কোন কথাই বললাম না। দিনকে দিন আমার ভয় আর ফার্সটেশন বারতে লাগলো। কারন আমি জানতাম ওই দিকে কোন বাড়ি নেই। আছে শুধু একটা তালগাছ। কিন্ত দিনের বেলা জানালা খুললে কিছু দেখা যেত না ওই তালগাছ টা ছাড়া। ছিল মানুষের কোন চিহ্ন।
কিছু দিন পর এক রাতে বাইরে প্রচুর বৃষ্টি তার উপর বিদ্যুৎও নেই। পুরো এলাকা একদম অন্ধকার। ফোনের আলো জ্বালিয়ে বিছানায় বসে আছি। হঠ্যাৎই জ্বালালার কাছে একটা বিকট শব্দ। কেউ যে হা… হা .. করে হাসছে। আর বিদ্যুৎ চমকানোর আলোতে একটা মেয়েলী শরীর জানালার ওপারে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। দেখলাম জ্বানালার কাচে উপর ধীরে ধীরে েএকটা হাতের পাচটা আঙুল দিয়ে বার বার জানালা খোলার চেষ্ট করছে। যে ভেতরের দিকে আসার জন্য ছটফট করছে।
এটা দেখতেই আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমার পুরো শরীর কাপছিল।
আমি ভাংগা ভাঙা গলায় বললাম ,- কে ওখানে?
তখনই উত্তর এলো আমি এই ঝড়ে মরে যাচ্ছি প্লিজ দরজাটা খোলে। কিন্ত আমি জানালাটা খুললাম না। আর সারারাত ভয়ে ঘুমাতে পারলাম না। পরদিন সকাল হতেই চলে গেলাম সেই চাচার সাথে দেখা করতে।
গিয়েই চাচাকে বললাম
— চাচা আজ আমাকে সত্যি করে বলেন তো জানালার ওপাশে কে আছে? যে আমাকে প্রতিদিন রাতে জানালা খুলতে বলে।
চাচা যেন থমকে গেল। চুপচাপ থাকল কয়েক সেকেন্ড। তারপর চাচা নিচো গলায় বলল ওটা আমার মেয়ে। সাদিয়া। ১১ বছর হলো সে আর পৃথিবীতে নেই।
কয়েক বছর আগের ওই বাড়িতে একটা মেয়ে ছিল লামিয়া। মেয়েটা আমার মেয়ের সাথেই পড়তো। তারা একজন অন্য জনকে ছাড়া ১মিনিটও থাকতে পারতো না। এভাবেই তাদের মেলা মেশায় একদিন তারা অনেক ক্লোজ সম্পর্কে জরিয়ে পরে। দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেলে। কিন্ত এটা কি কখনো মেনে নেয়া যায়। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে ভালবাসবে।
এটা যখন জানাজানি হয়। তখন ওরা একে আপরকে বিয়ে করতে চায়। আর নানা পাগলামি শুরু করে। তখন লামিয়ার বাবা জোর করে লামিয়াকে অন্য জায়গা বিয়ে দিয়ে দেয়। আর তাতেই আমার মেয়ে সাদিয়া ওই জানালা সামনের তালগাছে গিয়ে আত্মহত্যা করে। আর মেয়েটা অনেক কষ্টে মরে ছিল। আর তারপর দিন লামিয়াও বাড়ি চলে আসে আর তুমি বর্তমানে যে রুমে থাকে সেই রুমেই মারা যায়। তারপর থেকেই ওই বাড়িটা অভিশপ্ত হয়ে যায়।
চাচা এসব কথা বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে আঝড়ে পানি ঝড়ছিল।
আর এটা শুনেই আমার কলিজার সব পানি শুকিয়ে যায়। আর আমার শরীর কাপতে শুরু করে। এরপর চাচা আরো বলে সেই থেকে ওই বাসাতে আর কেউ থাকেনি। বাড়িটা ওভাবেই পরে ছিল। কেউ ওই বাড়ি কিনতে সাহস পাইনি। রাতে ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যারা যেত তারাও ওই জানালার পাশে অনেক কথা শুনতে পেত। কখনে একজন বা কখনো দুইজনের।
এটা শুনে আমি বাবাকে বলে ওই জানালা টাই পুরো বন্ধ করে ওয়াল করে দেই। আর ওই তালগাছ টাও কেটে ফেলি। আর তার পর থেকে আর কোনদিন কারো কানার আওয়াজ শুনতে পাইনি।